প্রথম পাওয়া পনেরোর পরিচয় | লেখক শাকিল আহমেদ | “Prothom pawa ponaror porichoy" | প্রথম পাওয়া পনেরোর পরিচয় by Shakil Ahmmed | ছোটগল্প প্রথম পাওয়া পনেরোর পরিচয় | Shakil Ahmmed
লেখালেখি করতে বরাবরই ভালো লাগতো। কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেল, কিছু লেখা হয়ে ওঠে না। তাই আজ হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলাম কিছু একটা লিখে ফেলবো। কিন্তু কি লিখা যায়? চলুন আপনাদের ছোটবেলার একটা ঘটনা বলি।
গল্পটা আমার শিক্ষা জীবনের শুরুর দিকের। তখনকার দিনে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নানাবাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার একটা রেওয়াজ ছিল। সেই রেওয়াজের সূত্র ধরেই বাবার সাথে দুই চাকার মোটরযানে করে নানার বাড়ি যাব বলে রওনা দিলাম। আমিতো অত্যন্ত আনন্দিত। কতই না মজা হবে নানা বাড়িতে। কিন্তু মাঝপথ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরতে হলো। কিন্তু কেন? সেদিন কি হরতাল ছিল? না, ছিল না। তবে দুর্ঘটনা? না কোনো দুর্ঘটনাও ঘটেনি। আবার আরেক অর্থে দুর্ঘটনা না বলেও পারি না।
যদিও আমি ঘটনা ব্যাখ্যা করায় দক্ষ নই, তবুও আমার মত করে বলে যাই। আমার বাবা ছোটকাল থেকেই চাইত আমি যেন বড় হয়ে আমাদের থানার মধ্যে সবচেয়ে বড় অফিসার হই। যেমন স্বপ্ন তেমনি কাজ। বয়স আমার মাত্র তিন বছর। বাবা ডাকটা ঠিকমতো দিতে শিখিনাই। কিন্তু বাবা আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আবার আশেপাশের কোন স্কুলেও নয়। বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে, থানা শহরের একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমি তো কিছু বুঝিনা। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতাম; যে স্কুলে গেলে তো টাকা পাওয়া যাবে। কারণ বাবা আমাকে যাতায়াত ভাড়ার পাশাপাশি বেশ কিছু টাকা খাওয়ার জন্য দিতেন। আমিতো দারুণ খুশি। কেননা দিন তো ভালই যাচ্ছে।
পুরো বছর ভালোই দিন কাটালাম। দেখতে দেখতে বছর শেষ হয়ে আসলো। বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে দিলাম। আমি তো আরো বেশি খুশি। বেশ কয়েক দিন স্কুল বন্ধ থাকবে। এই বন্দের সময়টা আরো মধুর করতে, নানা বাড়িতে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাবার সঙ্গে নানা বাড়ি যাচ্ছি। সবই ঠিকঠাক। কিন্তু এক জায়গায় ঝামেলা। আর ঝামেলাটা হলো, নানাবাড়ি ও বাসার মাঝপথেই আমাদের স্কুল।
আমার বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশিত হয়েছে কিনা তা জানার জন্য বাবা স্কুলের সামনে থামালেন। বাবা অনেক আশা নিয়ে জনৈক শিক্ষকের কাছে আমার রেজাল্ট জানতে চাইলেন। আর এই দিকে পরীক্ষা কি জিনিস আমি সেটাই জানিনা। শিক্ষক তৎক্ষণাৎ আমার রেজাল্ট তৈরি করে বাবার হাতে রেজাল্ট কার্ডটি প্রদান করলেন। রেজাল্ট কার্ড পাওয়ার পর বাবার প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে চাইনা। বরং আপনাদেরকে আমার রেজাল্ট সম্পর্কে বলি। তাহলেই বাবার প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারবেন।
রেজাল্ট কার্ডে মোট বিষয় সংখ্যা ছিল আটটি। আমি একটি বিষয়ে সবচেয়ে ভালো করেছিলাম। আর সেটা হল মৌখিক অভীক্ষা। কারণ এই পরীক্ষায় আমাকে শুধু আমার নাম জিজ্ঞেস করা হয়েছিল এবং আমি তা সঠিকভাবে বলতে পেরেছিলাম। এই বিষয়ে নম্বর বরাদ্দ ছিল দশ। বাবা রেজাল্ট কার্ডটি আমার হাতে দিলেন। আমি তো তখনও রিডিং পড়তে পারতাম না। কিন্তু একদম নিচে দেখলাম বড় করে লেখা পনেরো। তার উপর থেকে ধারাবাহিকভাবে সাতটা শূন্যের পরে একটি দশ ও একটি পাঁচ লক্ষ্য করলাম। এটা বুঝতে দেরী হলো না যে আমার মোট নম্বর পনেরো। রেজাল্ট কার্ডের আরেক জায়গায় পনেরো লেখা দেখতে পেলাম। আর এটা ছিল এরকম : 15/12/2005;
রুম থেকে বের হয়ে বাবা গাড়ি ঘোরালেন এবং আমাদের বাসায় ফিরে আসতে হলো। মাঝপথে বাবা আমাকে প্রচুর উপদেশ ও গালি শুনিয়ে দিলেন। এর মধ্যে পনেরো শব্দের একটি উপদেশ আমার মনে আছে। আর এটা এরকম : “পড়ালেখা না করিলে পরের গলগ্রহ হয়ে থাকতে হয়, তাই প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য পড়তে হয়”।
নানাবাড়ি আর যাওয়া হলো না, অশ্রুসিক্ত নয়নে বাড়ি ফিরলাম এবং বাবার উপদেশ কাজে লাগানোর মিশনে নেমে পড়লাম। বেশ কয়েক বছর পরে রেজাল্ট কার্ডটা আরেকবার দেখার সৌভাগ্য আমার হয়। এবং আমার পনেরো নম্বর এর ইতিহাসের অদ্যপান্ত জানতে পারি। মৌখিক এ দশ এবং উপস্থিতিতে পাঁচ । সব মিলিয়ে পনেরো। যাইহোক আমি নিয়মিত ছাত্র ছিলাম, তাই না?